প্রিভি কাউন্সিলের ঐতিহাসিক বিবর্তন
প্রিভি কাউন্সিল মূলত নর্মানদের বিচারব্যবস্থা Curia Repis-এর বিবর্তনের ফল। কিংস বেঞ্চ, কোর্ট অব কমন ল কোর্টস, কোর্ট অব এক্সচেকার- এই প্রতিষ্ঠানগুলোর বিবর্তনের মধ্য দিয়ে স্বতন্ত্র একটি প্রতিষ্ঠান হিসেবে সতেরো শতকে রাজার বিশেষ কাউন্সিল হিসেবে প্রিভি কাউন্সিলের উদ্ভব ঘটে। আঠারো শতকে প্রিভি কাউন্সিলের কর্মকাণ্ড ও পরিসর বৃদ্ধি পায়। প্রিভি কাউন্সিলের গঠন ও কাঠামোতে সবচেয়ে গুরুতর পরিবর্তন আসে ১৮৩৩ সালের জুডিসিয়াল কমিটি অ্যাক্টের মাধ্যমে। এর মাধ্যমে ব্রিটিশ উপনিবেশসমূহের আপীল শুনানির জন্য লিগ্যাল এক্সপার্টদের নিয়ে জুডিসিয়াল কমিটি অব প্রিভি কাউন্সিল গঠিত হয় ।
অবসরপ্রাপ্ত ব্রিটিশ ও স্কটিশ বিচারকদের নিয়ে জু- ডিসিয়াল কমিটি গঠন করা হতো। সাধারণত ৩ জন, গুরুত্বপূর্ণ মামলায় ৫ জন নিয়ে কমিটি গঠিত হতো। এই কমিটিই আপিল ও শুনানি করে মতামত (opin ion) আকারে পেশ করতেন। তবে It was not bound by precedents. বিশ শতকের শুরুতে (১৯০৯) স্যার সৈয়দ আমীর আলী প্রিভি কাউন্সিলের প্রথম ভারতীয় সদস্য হিসেবে নিয়োগপ্রাপ্ত হন। এরপর লর্ড সত্যেন্দ্র প্রসন্ন সিংহ (১৯২৬) প্রমুখ ভারতীয় এ পদে নিযুক্ত হয়েছেন।
মেয়র আদালত থেকে আপীল
১৭২৬ সালের চার্টারের মাধ্যমে ভারত থেকে প্রিভি কাউন্সিলে আপীল করার দ্বার উন্মোচন হয়। আপীলের প্রক্রিয়া ছিল প্রথমে সংশ্লিষ্ট প্রদেশের গভর্নর-ইন-কাউন্সিলে এবং শেষে ইংল্যান্ডের প্রিভি কাউন্সিলে প্রেরণ করা। ১৭৯০ সাল পর্যন্ত অর্থাৎ দীর্ঘ চৌষট্টি (১৭৯০-১৭২৬) বছর কোন ভারতীয় প্রিভি কাউন্সিলে আপীল করেননি।
১৭৭৩ সালের রেগুলেটিং অ্যাক্ট পাসের আগ পর্যন্ত ভারত থেকে প্রিভি কাউন্সিলে একজন ইংরেজ চার ধরনের আপীল করতে পারতেন। Barrington vs. President and Council of Fort St. George (PC 2. vol. 91, p. 340) মামলার মাধ্যমে ফোর্ট উইলিয়াম থেকে প্রিভি কাউন্সিলে প্রথম মামলার আপীল করা হয়। ১৭৩০ সালে অন্ডারম্যানের দপ্তর থেকে ইংল্যান্ডে ফিরে যাবার জন্য গভর্নর ও কাউন্সিলের নির্দেশের বিরুদ্ধে বেরিংটন প্রিভি কাউন্সিলে আপীল করেছিলেন। কাউন্সিল এই মামলার রায় দেয়ার আগেই বেরিংটন আপীল তুলে নেন। ফোর্ট উইলিয়াম থেকে প্রিভি কাউন্সিলে দ্বিতীয়, তৃতীয় ও চতুর্থ মামলা ছিল যথাক্রমে William Mitchell vs. Nathanial Turner (PC 2, vol. 91, p. 619); Robert Adams vs. Mathew Wastal 1731, PC 2, vol. 92, p. 482 504 Moses Francia vs. James Hope 1739 PC 2, vol. 95, p. 665। তিনটি মামলারই বিবাদের বিষয় ছিল অর্ধসংক্রান্ত।
প্রিভি কাউন্সিলে আপীল করার শর্তাবলি
১৭৭৪ সালে কলকাতা সুপ্রীম কোর্ট প্রতিষ্ঠিত হয়। এবং মেয়র কোর্ট রহিত করা হয়। ১৭৭৪ সালের চার্টারের ৩০নং ধারার অধীনে সিভিল মামলার ক্ষেত্রে ১০০০ প্যাগোডার (ভারতের রাজবংশ এবং ব্রিটিশ, ফ্রেঞ্চ ও ডাচ কর্তৃক গৃহীত কারেন্সি। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি মাদ্রাজে এই কারেন্সির প্রচলন করেছিল। ২০১৫ সালের হিসেব অনুযায়ী সবচেয়ে সক্ষম হননি। মূল্যবান প্যাগোডা 'স্টার গোল্ড' এর মূল্য ছিল ৮ শিলিং বা ৭ ডলার) বেশি হলে সুপ্রীম কোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে কিং-ইন-কাউন্সিলে আপীল করার অধিকার প্রদান করা হয়। সুপ্রীম কোর্টের রায় প্রদানের ছয় মাসের মধ্যে আপীল গ্রহণ করা হত। কলকাতা সুপ্রীম কোর্টের বিচারিক কমিটির উপস্থিতিতে এধরনের আপীল করা যেত।
কলকাতা সদর দেওয়ানি আদালত থেকে প্রিভি কাউন্সিলে আপীল
১৭৮১ সালের অ্যাক্ট অব সেটলমেন্টের অধীনে সিভিল মামলার ক্ষেত্রে ৫০০০ পাউণ্ড বা ৫০,০০০ কপির সমপরিমাণ বা এর বেশি অর্থমূল্যের মামলা কলকাতা সদর দেওয়ানি আদালত থেকে হিজ ম্যাজিষ্ট্রির কাছে আপীল করার সুযোগ প্রদান করা হয়। মাদ্রাজ ও বোম্বেতে এধরনের আপীল করার সুযোগ হয় যথাক্রমে ১৮১৮ ও ১৯৯২ সালে।
১৮১৮ সাল থেকে আপীল করার ক্ষেত্রে গুরুত্ব অনুসারে মামলা নির্বাচনের বিষয়টি বাদ দেয়া হয়। এর পর থেকে বোম্বে ও মাদ্রাজের সদর দেওয়ানি আদালত থেকে সকল ধরনের মামলা প্রিভি কাউন্সিলে আপীল করা যেত। এর ফলে প্রিভি কাউন্সিলে আপীলের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে বেড়ে যায়। একইভাবে কাউন্সিলে আপীল করাও অত্যন্ত জটিল ও ব্যয়সাধ্য হয়ে পড়ে।
হাইকোর্ট থেকে প্রিভি কাউন্সিলে আপীল
১৮৬১ সালের চার্টারের অধীনে হাইকোর্ট প্রতিষ্ঠিত হয়। এই চার্টার এবং সিভিল প্রোসিডিউর কোড ১০৯ থেকে ১১২ নং ধারার অধীনে হাইকোর্ট থেকে প্রিভি কাউন্সিলে আপীল করার অনুমতি প্রদান করা হয়। তবে ফৌজদারি মামলায় হাইকোর্টের চূড়ান্ত রায়ের বিরুদ্ধে আপীল করা যেত না।
প্রিভি কাউন্সিলের সমালোচনা
প্রিভি কাউন্সিলের নিয়ম-নীতিতেও কতিপয় সমস্যা ছিল। যেমন- কাউন্সিলের সদস্যবৃন্দ ছিলেন কেবল ইংরেজদের নিয়ে; এর অবস্থান ছিল ইংল্যান্ডে, স্থানীয় আদালত সম্পর্কে কাউন্সিলের জানাশোনার অভাব: কাউন্সিল বিলেত হওয়ায় মামলারত ব্যক্তিদের বিভিন্ন ধরনের সমস্যার সম্মুখীন হতে হত। দেখা গেছে যে, রায়ে ভারতীয় দৃষ্টিভঙ্গি তেমন গুরুত্বের চোখে বিবেচনায় নেয়া হত না। মামলারত দরিদ্র ব্যক্তিদের জন্য এ ছিল কঠিন সমস্যা। কিছু কিছু মামলায় কাউন্সিল রায়ের ক্ষেত্রে নিরপেক্ষতাও বজায় রাখতে সক্ষম হননি।
এত কিছুর পরও এখনো প্রিভি কাউন্সিল ভারতের খ্যাতনামা আইনজীবী, বিচারক এবং জনগণের কাছে সর্বোচ্চ বিচারিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে সুমহান মর্যাদা পেয়ে থাকে।
উৎস :
3. VD Kulshrestha, Revised by BM Gandhi, Landmarks in Indian Legal and
Constitutional History, P. 182-191 2. William H. Marley, The Administration of Justice in British India, First Published 1858, p. 139-155
3. MP Jain, Outlines of Indian Legal History, First Edition 1952, p. 317-362
ইফতিখারুল ইসলাম

